গাইবান্ধা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) আসন। বড় দলগুলোর প্রচার-প্রচারণায় মুখর জনপদ। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এই আসনে ঐতিহ্যগত শক্তির লড়াইয়ে বিএনপি প্রার্থী ডা. মইনুল হাসান সাদিকের চেয়ে প্রচার-প্রচারণা এবং জনসম্পৃক্ততায় অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু। ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের কৌশলী অবস্থান ও তৃণমূলের সক্রিয়তা এই আসনে নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জামায়াতের নেতা-কর্মীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি তৎপর। তফসিল ঘোষণার পর জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে কর্মীরা অন্তত তিন দফা ভোটারদের কাছে পৌঁছেছেন, যেখানে বিএনপির সংযোগ এখনও ততোটা সুসংগঠিত নয়। ৫ নং মহদীপুরের ভোটার সিরাজুল ইসলাম জানান, "ভোটের ডামাডোল শুরুর পর থেকে জামায়াতের লোকরা বারবার আসছে, কিন্তু বিএনপির নেতাদের কোথাও দেখা গেছে আবার কোথাও দেখা যায় নাই"।
ডা. মইনুল হাসান সাদিকের নিজ উপজেলা সাদুল্যাপুর হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ধানের শীষের কর্মীদের মধ্যে এক ধরণের হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয়দের মতে, দলটির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাগজে-কলমে মিটমাট হলেও ভেতরে ভেতরে রয়ে গেছে চাপা ক্ষোভ। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর জেল-জুলুম সহ্য করা জামায়াত কর্মীরা এবার একে দেখছেন 'ভোট বিপ্লবের' সুযোগ হিসেবে। প্রতিশোধ নয়, বরং বিজয়ের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সাবধানী।
জামায়াতের জনপ্রিয়তার পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তাদের সামাজিক কর্মকাণ্ড। আমলাগাছীর এক সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটার জানান, একটি ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের বিনিময়ে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা টাকা দাবি করলেও জামায়াত নেতারা তা বিনামূল্যে সমাধান করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমালের নিরাপত্তায় মাঠপর্যায়ে জামায়াত কর্মীদের সক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
'
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এবং মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে পরখ করার পর ভোটারদের বড় একটি অংশ এবার পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। বিশেষ করে বয়স্ক ভোটার ও তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এবার একজন 'আলেম' প্রার্থীকে সংসদে পাঠাতে আগ্রহী। তরুণদের মতে, তারা তাদের প্রথম ভোটটি একজন মার্জিত ও শিক্ষিত মানুষকে দিতে চান। জামায়াত কর্মীদের মার্জিত আচরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা হাট-ঘাট দখলের কোনো অভিযোগ না থাকা দলটিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
ভোটের পরিসংখ্যানেও নজরুল ইসলাম লেবু বেশ শক্তিশালী। ইতিপূর্বে ৪ বার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে গতবার প্রায় ৮০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন তিনি। এমনকি ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ও দলীয় ভোটব্যাংকের সক্ষমতা প্রমাণ করেছিলেন।
আদর্শিক রাজনীতি এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জামায়াত এখন গাইবান্ধা-৩ আসনে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিএনপির সাংগঠনিক শিথিলতা এবং জামায়াতের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার এই দ্বৈরথে শেষ হাসি কে হাসবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত মাঠের লড়াইয়ে 'দাঁড়িপাল্লা'র হাওয়া যে বেশ জোরালো, তা বলাই বাহুল্য।

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬
গাইবান্ধা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) আসন। বড় দলগুলোর প্রচার-প্রচারণায় মুখর জনপদ। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এই আসনে ঐতিহ্যগত শক্তির লড়াইয়ে বিএনপি প্রার্থী ডা. মইনুল হাসান সাদিকের চেয়ে প্রচার-প্রচারণা এবং জনসম্পৃক্ততায় অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু। ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের কৌশলী অবস্থান ও তৃণমূলের সক্রিয়তা এই আসনে নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জামায়াতের নেতা-কর্মীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি তৎপর। তফসিল ঘোষণার পর জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে কর্মীরা অন্তত তিন দফা ভোটারদের কাছে পৌঁছেছেন, যেখানে বিএনপির সংযোগ এখনও ততোটা সুসংগঠিত নয়। ৫ নং মহদীপুরের ভোটার সিরাজুল ইসলাম জানান, "ভোটের ডামাডোল শুরুর পর থেকে জামায়াতের লোকরা বারবার আসছে, কিন্তু বিএনপির নেতাদের কোথাও দেখা গেছে আবার কোথাও দেখা যায় নাই"।
ডা. মইনুল হাসান সাদিকের নিজ উপজেলা সাদুল্যাপুর হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ধানের শীষের কর্মীদের মধ্যে এক ধরণের হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয়দের মতে, দলটির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাগজে-কলমে মিটমাট হলেও ভেতরে ভেতরে রয়ে গেছে চাপা ক্ষোভ। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর জেল-জুলুম সহ্য করা জামায়াত কর্মীরা এবার একে দেখছেন 'ভোট বিপ্লবের' সুযোগ হিসেবে। প্রতিশোধ নয়, বরং বিজয়ের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সাবধানী।
জামায়াতের জনপ্রিয়তার পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তাদের সামাজিক কর্মকাণ্ড। আমলাগাছীর এক সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটার জানান, একটি ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের বিনিময়ে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা টাকা দাবি করলেও জামায়াত নেতারা তা বিনামূল্যে সমাধান করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমালের নিরাপত্তায় মাঠপর্যায়ে জামায়াত কর্মীদের সক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
'
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এবং মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে পরখ করার পর ভোটারদের বড় একটি অংশ এবার পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। বিশেষ করে বয়স্ক ভোটার ও তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এবার একজন 'আলেম' প্রার্থীকে সংসদে পাঠাতে আগ্রহী। তরুণদের মতে, তারা তাদের প্রথম ভোটটি একজন মার্জিত ও শিক্ষিত মানুষকে দিতে চান। জামায়াত কর্মীদের মার্জিত আচরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা হাট-ঘাট দখলের কোনো অভিযোগ না থাকা দলটিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
ভোটের পরিসংখ্যানেও নজরুল ইসলাম লেবু বেশ শক্তিশালী। ইতিপূর্বে ৪ বার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে গতবার প্রায় ৮০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন তিনি। এমনকি ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ও দলীয় ভোটব্যাংকের সক্ষমতা প্রমাণ করেছিলেন।
আদর্শিক রাজনীতি এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জামায়াত এখন গাইবান্ধা-৩ আসনে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিএনপির সাংগঠনিক শিথিলতা এবং জামায়াতের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার এই দ্বৈরথে শেষ হাসি কে হাসবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত মাঠের লড়াইয়ে 'দাঁড়িপাল্লা'র হাওয়া যে বেশ জোরালো, তা বলাই বাহুল্য।

আপনার মতামত লিখুন